১৯৭১ সালে শহীদ হওয়া বৃহত্তর নোয়াখালীর বুদ্ধিজীবীরা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ধরে এই দেশের স্বাধীনতা বিরোধী আল বদর, আল-শামস আর রাজাকারের সহযোগিতায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছে বাংলার বুদ্ধিজীবীদের। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে পরিচালনা করারমত সকল বুদ্ধিজীবীদেরকে শেষ করে বাংলাকে পঙ্গু করে দেওয়া। এই জন্য তাঁরা তৈরি করেছে নীল নকশা। পুরো যুদ্ধকালে বিভিন্ন সময় তাঁরা আমাদের অনেক কবি সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, শিক্ষক, চিকিৎসক সহ অনেক জ্ঞানী ব্যাক্তিকে হত্যা করেছে। তারা তাদের চূড়ান্ত আক্রমণ করেছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার ঠিক ২ দিন আগে ১৪ডিসেম্বর। ১৩ ডিসেম্বর রাতে তাঁরা এইদেশের  প্রখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকা করে হত্যা করেছে। তৈরি করেঠ বধ্যভূমি যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল আমার বাংলার মেধাবীরা। এখানে আমরা বৃহত্তর নোয়াখালীর কয়েকজন  বুদ্ধিজীবী সর্ম্পকে জানব যারা পাক বাহিনী ও তাদের দোষরদের নীল নকশার স্বীকার হয়ে শহীদ হয়েছেন।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এওকজন গবেষক। ১৯৭১ সালে বাঙালী জাতিকে মেধাশূন্য করার প্রয়াসে আল বদর, আল শামস এর সহযোগিতায় পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশার বলি হোন তিনি।

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ১৯২৬ সালের  ২২শে জুলাই  নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানার খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম বজলুর রহমান চৌধুরী ও মাতার নাম মাহফুজা খাতুন।  তিনি নোয়াখালীর সোনাপুরের আহমদিয়া হাই ইংলিশ স্কুল থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন ও মেধা তালিকায় ৪র্থ স্থান লাভ করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি ঢাকা কলেজ  থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে মেধা তালিকায় প্রথম স্থান লাভ করেন।

বাংলার প্রতি তাঁর আলাদা দরদ কাজ করতো ।১৯৪৬ সালে তিনি নন-কলেজিয়েট পরীক্ষার্থী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রথম স্থান লাভ করেন। এ সাফল্যের জন্য তাকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় “সুরেন্দ্রনলিনী স্বর্ণপদক” প্রদান করে। পরবর্তীতে আবার তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্যার আশুতোষ গোল্ড মেডেল দিয়ে পুরস্কার লাভ করেন। এর কারণ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০০ বছরের ইতিহাসে তার মত এত বেশি নম্বর পেয়ে কেউ বাংলা (সম্মান)-এ ডিগ্রী অর্জন করেনি।

১৯৪৯ সালে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রে পাণ্ডুলিপি রচয়িতা হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এর পরের বছর (১৯৫০ সালে) জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক পদে যোগ দেন। ১৯৫৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করে ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭০ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে সংবর্ধনা দেয়। একই বছরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

পাকিস্তান হানাদার বাহিনী জানত এই মহান ব্যক্তি বেকঁচে থাকলে শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলার সাফল্য অবধারিত হবে। তাই ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর আল-বদর বাহিনী তাকে তার কনিষ্ঠ ভাই লুতফুল হায়দার চৌধুরীর বাসা থেকে অপহরণ করে। এর পর তাঁর আর কোন খবর পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয় ঐ দিনই তাকে হত্যা করা হয়।

ড. হাবিবুর রহমান

ড. হাবিবুর রহমান

ড. হবিবুর রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যপক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানী বাহিনী হবিবুর রহমানকে তার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসভবন থেকে ধরে নিয়ে যায় এবং এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় তিনি  বিশ্ববিদ্যলয়েই থেকে যান এবং এখানে অবস্থানরত বিভিন্ন মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন। তিনি ১৯২১ সালের ১ লা জানুয়ারি নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার বালিয়াধার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলবি কলিম উদ্দিন ভূঁইয়া ও মাতার নাম সিদ্দীকা খাতুন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন কৃষক।

ড. হাবিবুর রহমান ছাত্র হিসেবে ছিলেন তুখোড় মেধাবী। ১৯৪৩ সালে  তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর এম.এস.সি. ডিগ্রীতে ভর্তি হযন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৪৬ সালে তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেকর্ড নম্বরসহ গণিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম.এস.সি. ডিগ্রি লাভ করেন। তার এই অসাধারণ ফলাফলে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার  উপাচার্য ও প্রখ্যাত গণিত বিশারদ স্যার জিয়াউদ্দীন বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এ. কে. ফজলুল হকের নিকট হবিবুরকে স্টেট স্কলারশিপ ও চাকরি দেওয়ার জন্য বিশেষ সুপারিশপত্র দেন। কিন্তু তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে গণিতের প্রভাষক পদে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালের নভেম্বরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করেন। তিনি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে ট্রাইপস ডিগ্রি লাভ করেন।

আরো পড়ুনঃ বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমিন-নোয়াখালীর গর্ব

মুনীর চৌধুরীর

নোয়াখালীর শহীদ বুদ্ধিজীবী

মুনীর চৌধুরীর পুরো নাম আবু নয়ীম মোহাম্মদ  মুনীর চৌধুরী। তিনি ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর জন্ম গ্রহন করেন। তার পৈতৃক নিবাস  নোয়াখালী জেলার চাটখিল থানাধীন গোপাইরবাগ গ্রামে। তিনি ছিলেন একাধারে  শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক ও  ভাষাবিজ্ঞানী।

মুনীর চৌধুরী ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল (বর্তমান ঢাকা কলেজ) থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন এবং ১৯৪৩ সালে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে আইএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স (১৯৪৬) এবং মাস্টার্স (১৯৪৭) পাস করেন, উভয় ক্ষেত্রেই দ্বিতীয় শ্রেণীতে। তাঁর বক্তিতার ধরণ ছিল অপূর্ব। এই জন্য তিনি ছাত্রাবস্থাই অনেক পুরষ্কার জিতেছিলেন। ছাত্র থাকা অবস্থায় তাঁর রচিত  এক অঙ্কের নাটক রাজার জন্মদিনে লিখে জনপ্রিয়তা পান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন যার কারণে তাকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এক সময়  পিতার আর্থিক সাহায্য থেকেও বঞ্চিত হন। তখন  তিনি ঢাকা বেতার কেন্দ্রের জন্য নাটক লিখে আয় করে নিজের খরচ জোগায় করতেন।। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ‌১৯৪৭ সালের ৬ই ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রথম ছাত্রসভা তিনি বক্তৃতা করেন।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে মিছিলে গুলির প্রতিবাদে  ২৬শে ফেব্রুয়ারি শিক্ষকদের প্রতিবাদ সভা আহ্বান করতে গিয়ে গ্রেফতার হন এবং প্রায় দুই বছর তিনি দিনাজপুর ও ঢাকা জেলে বন্দী জীবনযাপন করেন। বন্দী থাকা  অবস্থায় ১৯৫৩ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারির জন্য তিনি লিখে ফেলেন ”কবর” নাটক। যেটি তাঁর এক যুগান্তকারী সৃষ্টি।

মুনির চৌধুরী তাঁর ছাত্রাবস্থায়ই পাকিস্তান বাহিনীর বিভিন্ন বৈষ্যম নিয়ে সোচ্ছার ছিলেন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান সরকারের হাতে বন্দী হন । বিভিন্ন সময়ে তিনি পাকিস্তান বাহিনীর বাংলা বিরোধী পদক্ষেপেরে প্রতিবাদ করেন। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার বাংলা বর্ণমালাকে রোমান বর্ণমালা দিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিলে তিনি এর প্রতিবাদ করেন। ১৯৭১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের সময়ে সে আন্দোলনের সমর্থনে সিতারা-ই-ইমতিয়াজ খেতাব বর্জন করেন।

মুনীর চৌধুরীর কিশোর ছেলে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে চলে যায়। এসময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আদেশে মে-জুন মাসে ইংরেজি বিভাগের প্রধান হিসেবে এবং জুলাই মাস থেকে কলা অনুষদের ডীন হিসেবে কাজ করেন। ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর মাসে পাক বাহিনীর নীল নকশা অনুযায়ি মুনীর চৌধুরীকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীদের সহযোগী আল-বদর বাহিনী তার বাবার বাড়ি থেকে অপহরণ করে ও সম্ভবত ঐদিনই তাকে হত্যা করে।

সিরাজুল হক খান

সিরাজুল হক খান

সিরাজুল হক খান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।১৯৭১ সালে ১৪ ডিসেম্বর অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের সাথে  পাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের অংশ হিসাবে তাকেও অপহারণ করে এবং হত্যা করে।

সিরাজুল হক খান ১৯২৪ সালের ১লা জানুয়ারি ফেনী জেলা পরশুরাম উপজেলার সাতকুচিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন।তাঁর বাবার নাম চাঁদ মিয়া খান ও  মা ইজ্জাতননেছা। কর্মজীবনের প্রায় ১৭ বছর বিভিন্ন সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করার পর ১৯৬৮ সালের ১১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

দেশীয় আল বদর আর রাজাকারের টার্গেটে পরিণত হন এই মহান ব্যক্তি। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে তাকেও অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের সাথে হত্যা করা হয়।

এম এম ফয়জুল মহিউদ্দিন

এম এ এম ফয়জুল মহিউদ্দিন ১৯৩৯ সালে ফেনীতে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতেন।  আর এই দেশীয় রাজাকার আর আল বদর বাহিনীর তীক্ষ্ম নজর ছিল তাঁর প্রতি। সব সময় তাকে চোখে চোখে রাখতেন আল বদর বাহিনী।  ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে এসে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের অংশ হিসাবে তাকেও অপহরণ করা হয় ও পরে হত্যা করা হয়।

শহীদুল্লা কায়সার

শহীদুল্লা কায়সার

শহীদুল্লা কায়সার ১৯২৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মাজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী। তার প্রকৃত নাম ছিল আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লা। তার পিতার নাম মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ্ এবং মাতার নাম সৈয়দা সুফিয়া খাতুন৷

শহীদুল্লাহ কায়সার তার লেখনীর মাধ্যমে পাকিস্তান বাহিনীর বিভিন্ন বৈষ্যমের কথা তুলে ধরেন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগদান করেন। এই জন্য তাকে বিভিন্ন সময় গ্রেফাতার হতে হয়।তিনি দেশপ্রেমিক ছদ্মনামে রাজনৈতিক পরিক্রমাবিশ্বকর্মা ছদ্মনামে বিচিত্রা কথা শীর্ষক উপ-সম্পাদকীয় রচনা করেছেন যেগুলোর মাধ্যমে তাঁর প্রতিবাদ তুলে ধরতেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন সময় পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী দ্বারা নির্যাতিত ও গ্রেফাতার হয়েছিলেন। “সংসপ্তক” সহ বহু আলোচিত ও প্রতিবাদি নাটক ও উপন্যাস রচনা করেছেন তিনি।

পাক বাহিনীর নীল নকশার বলি হন এই বুদ্ধিজীবীও। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় আলবদর বাহিনীর কজন সদস্য তাকে তার বাসা ২৯, বিকে গাঙ্গুলী লেন থেকে ধরে নিয়ে যায়। তারপর তিনি আর ফেরেন নি। আর কখনও ফিরবে না।

সেলিনা পারভীন

সাংবাদিক সেলিনা পারভীন

সাংবাদিক সেলিনা পারভীন ছিলেন এক প্রতিবাদী কষ্ঠ। তিনি সাপ্তাহিক বেগম, সাপ্তাহিক ললনা, ও শিলালিপি পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সেলিনা পারভীন ১৯৩১ সালের ৩১ মার্চ ফেনীতে জন্ম গ্রহন করেন।তার পিতা মোঃ আবিদুর রহমান শিক্ষকতা করতেন। সেলিনা পারভীনের লেখনীর প্রতি জোঁক সেই ছোট বেলা থেকেই। ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁদের ফেনী বাড়ি দখল হয়ে যায়। তখন থেকেই তিনি তাঁর লেখনীতে প্রতিবাদের ভাষা ফুটিয়ে তুলতেন। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তিনি সাহিত্যের অনুরাগী হয়ে গল্প ও কবিতা লিখা শুরু করেন। সামাজিক কুসংস্কারের বলি হয়ে ১৪ বছর বয়সেই বিয়ের পিড়িতে বসতে হয়। কিন্তু তিনি কখনও দমে যান নি। ১৯৬৯ সালে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বের করেন শিলালিপি নামে একটি পত্রিকা। তিনি নিজেই এটি সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করতেন। দেশের প্রায় সব বুদ্ধিজীবীদের লেখা নিয়ে প্রকাশিত হতো শিলালিপি। আর এতেই এটি সকলের নজর কেড়েছিল। স্বাধীনতার পক্ষের পত্রিকা ছিল শিলালিপি। এই সুবাদে ঢাকার বুদ্ধিজীবী মহলে অনেকের সাথেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন তিনি। অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর চোখে অপরাধী হয়ে উঠেন। যার দরুন বারবার তাঁর পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি প্রতক্ষভাবে যোগ দিতেন মিছিল, সমাবেশে। প্রতিবাদ করতেন নিজের লেখনী আর প্রকাশনার মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তরুন এক দল মুক্তিযুদ্ধার আশ্রয় দিতেন তিনি। এই তরুণদের সকলেই ছিলেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা। খাওয়া-দাওয়া করে চলে যাওয়ার আগে এরা সেলিনা পারভীনের কাছ থেকে সংগৃহীত ঔষধ, কাপড় আর অর্থ নিয়ে যেতেন। শিলালিপির বিক্রয় করে যে অর্থ পেতেন তাঁর সবটুকুই খরচ করতে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতে।

১৩ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সাল। দেশ স্বাধীন হতে আর মাত্র তিন দিন বাকি। সাংবাদিক সেলিনা পারভীন তখন বাস করতেন সিদ্ধেশ্বরীতে। ১১৫ নং নিউ সার্কুলার রোডে তার বাড়ীতে থাকতো তাঁর মা, পুত্র সুমন আর ভাই উজির। সেদিন শীতের সকালে তারা সকলেই ছিলেন ছাদে। সেলিনা পারভীন সুমনের গায়ে তেল মাখিয়ে দিচ্ছিলেন। ঢাকা  শহরে তখন কারফিউ আর রাস্তায় মিলিটারি বাহিনীর টহল। পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য বিমান থেকে চিঠি ফেলা হচ্ছে। হঠাৎ দূরে একটা গাড়ির আওয়াজ হলো। একদল আল বদর বাহিনী  সেলিনাদের ফ্ল্যাটে এসেও কড়া নাড়ে। সেলিনা পারভীন নিজে দরজা খুলে দেন। লোকগুলো তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হযয়ে তাকে তাদের সাথে ধরে নিয়ে যায়। ১৮ ডিসেম্বর সেলিনা পারভীনের গুলিতে-বেয়নেটে ক্ষত বিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। খুব শীতকাতুরে সেলিনার পায়ে তখনও পড়া ছিল সাদা মোজা। এটি দেখেই তাকে সনাক্ত করা হয়।

জহির রায়হান

নোয়াখালীর শহীদ বুদ্ধিজীবী

জহির রায়হান ছিলেন একজন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি ১৯৩৫ সালের ১৯ আগষ্ট ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সাংবাদিক শহীদুল্লাহ কায়সারের ভাই।

তার রচিত প্রথম উপন্যাস শেষ বিকেলের মেয়ে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয়। তার রচিত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো হাজার বছর ধরেআরেক ফাল্গুনহাজার বছর ধরে উপন্যাসের জন্য ১৯৬৪ সালে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র কখনো আসেনি (১৯৬১)। ১৯৬৪ সালে কাঁচের দেয়াল চলচ্চিত্রের জন্য তিনি নিগার পুরস্কার লাভ করেন। তার নির্মিত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলো হলো বেহুলা, সঙ্গম, আনোয়ারা এবং জীবন থেকে নেওয়াস্টপ জেনোসাইড প্রামাণ্যচিত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে প্রশংসিত হন।

জহির রায়হান দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭১ এর ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরে আসেন এবং তার নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে শুরু করেন, যিনি স্বাধীনতার ঠিক আগমুহূর্তে পাকিস্তানি আর্মির এদেশীয় দোসর আল বদর বাহিনী কর্তৃক অপহৃত হয়েছিলেন। জহির রায়হান ভাইয়ের সন্ধানে মিরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসেন নি। ১৯৭২ এর ৩০ জানুয়ারির পর তাঁর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়না। মিরপুর ছিল ঢাকা থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত বিহারী অধ্যুষিত এলাকা এবং এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে যে সেদিন বিহারীরা ও ছদ্মবেশী পাকিস্তানী সৈন্যরা বাংলাদেশীদের ওপর গুলি চালালে তিনি নিহত হন।

 

(Visited 1,200 times, 1 visits today)
Share this story with your friends:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *