মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাকিম || বীর বিক্রম

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী জাতির আলাদা সত্তা গড়ার লড়াই। এই লড়াইয়ে বাংলার জনগণ নিজেদের জীবন বাজি রেখে মোকাবেলা করেছেন হানাদার পাকিস্তান বাহিনীকে। গড়ে তুলে প্রথিবীর বুকে এক আলাদা ইতিহাস। যে ইতিহাস রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, যে ইতিহাস সাহসীকতার ইতিহাস, সেই ইতিহাস নিজেদের অধিকারের জন্য মাথা নত না করার ইতিহাস। এই এই ইতিহাস রচনা করছে ৩০ লাখ মানুষ তাদের জীবন উৎসর্গ করেছে। লাখো মানুষ সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়েছে, অনেক নারী ধর্সিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সারা বাংলার মত আমাদের নোয়াখালীও প্রতিরোধ করেছে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তার দোষর রাজাকার, আল বদর, আল শাশস সহ সকল অপশক্তিকে। এই অপশক্তি রোখতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন নোয়াখালীর অনেক বীর সন্তান।অনেকে সফলভাবে ফিরে এসেসেন স্বাধীন বাংলার পতাকাতলে।আমাদের এমন এক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাকিম।

আরো পড়ুনঃ শহীদ আবুল বাশার || বীর বিক্রম || নোয়াখালীর গর্ব

নাম

আবদুল হাকিম।

জন্মস্থান

আবদুল হাকিম নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলার পাঁচগাঁও নিজ ভাওর গ্রামে জন্মগহন করেন।

জন্ম‍ সাল

তার জন্মসাল সর্ম্পকে কোন তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

যে কারণে পরিচিত

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অদম্য সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ  উপাধি “বীর বিক্রম”  উপাধিতে ভূষিত হন।

পরিবার পরিচিতি

পিতা: দীন মোহাম্মদ

মাতাঃ সাবেদা খাতুন

স্ত্রীঃ রুচিয়া খাতুন।

সন্তানঃ তিন ছেলে, দুই মেয়ে

কর্মজীবন

আবদুল হালিম ১৯৭১ সালে ইপিআর এ চাকরি করতেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি চট্টগ্রাম ইপিআর সেক্টর হেডকোয়ার্টার্সের অধীনে ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

১৯৭১ সালের  পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর হামলার সময় আবদুল হালিম চট্টগ্রাম িইপিআর এ অবস্থান করছিলেন। চারদিকে যখন যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি। নিজের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশকে শত্রুমুক্ত করতে। মুক্তিযুদে।দ যোগদানের কিছুদিন পর তিনি ১ নম্বর সেক্টরে কিছুদিন যুদ্ধ করেন। এরপর নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আলফা কোম্পানিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । তিনি ছাতক, গোয়াইনঘাটসহ আরও বেশ কয়েক স্থানে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন।

সীমান্ত অতিক্রম করে আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি

৫ নভেম্বর, ১৯৭১রাধানগরে পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে গুরুতর আহত হন আবদুল হাকিম। সিলেটের গোয়াইনঘাট এলাকার রাধানগর ছিল মূলত সীমান্ত এলাকায় ছোট একটি বাজার। বাজারের পূর্ব পাশ দিয়ে চলে গেছে  পিয়াইন নদীর শাখা। আর উত্তর পাড়ে ছিল জাফলং চা-বাগান। উত্তর-পূর্বদিকে কয়েক মাইল দূরে ছিল বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিওপি তামাবিল এবং ভারতের ডাউকি বিওপি। পাকস্তোনী বাহিনীর একটি শক্তিশারী ঘাঁটি ছিল এই রাধানগরসহ গোয়াইনঘাট এলাকা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট, পাঞ্জাব রেঞ্জার ও টসি ব্যাটালিয়ন এখানে প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত ছিল । অক্টোবর মাসের শেষ দিকে নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর ৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তানিদের এই শক্ত অবস্থানে আক্রমণের সিদ্ধন্ত নেয় । তারা সকল প্রস্তুতি মেষ করে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশের ভেতরে আসে।

আরো পড়ুনঃ পর্তুগালে উচ্চশিক্ষার সুবিধা

রাধানগরে ভয়াবহ যুদ্ধ

৪ নম্বর সেক্টরের ডাউকি সাব-সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা, জেড ফোর্সের ৩ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মিত্রবাহিনীর ৫/৫ গুর্খা রেজিমেন্টের একদল সেনা প্রস্তুত হয়ে আছে পাকিস্তানের ঘাঁটি গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য। তারা যৌথভাবে এ যুদ্ধে অংশ নেয়। আবদুল হাকিমসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা রাতে ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথে হেঁটে পৌঁছান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানের কাছে। সেখানে তারা কোদাল-খন্তা দিয়ে তৈরি করেন ছোট পরিখা খোঁড়েন। তারপর সকল মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান নেন এই পরিখার ভেতরে। প্রস্তুত হয়ে যান আক্রমেন জন্যঅ অপেক্ষা শুধু অধিনায়কের সংকেতের। অনেক্ষণ ধরে তারা সঠিক সময় আর অধিনায়কের সংকেতের জন্য অপেক্ষা করে ছিলেন। কিন্তু তারা আর আক্রমন করতে পারলেন না। পাক বাহিনী তাদের অবস্থান টের পেয়ে গেল।পাকিস্তানিরা তাদের সুরক্ষিত প্রতিরক্ষা অবস্থান থেকে শুরু করে আর্টিলারি ও মর্টারের গোলাবর্ষণ। এতো ভারি অস্ত্রশস্ত্র আর সংগঠিত আক্রমনে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে উঠছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য।

গুলি ভেদ করে গেলে আবদুল হাকিমের চোখ, বুক ও কোমর

পাকিস্তানি বাহিনীর গোলাবর্ষণ ও গুলিবৃষ্টিতে মুক্তিযোদ্ধাদের মাথা তোলাই প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছিল।এই চরম প্রতিকূল অবস্থা সত্ত্বেও আবদুল হাকিমসহ কয়েকজন সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি আক্রমণ মোকাবিলা করতে থাকেন। কিন্তু এতো ভারি অস্ত্রের মুখে আবদুল হাকিম বেশিক্ষণ লড়াই করতে পারলেন না। হঠাৎ একসঙ্গে চার-পাঁচটি গুলি এসে তার চোখ, বুক ও কোমরে লাগল । মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন আবদুল হাকিম।

যৌথ এই আক্রমনটি ব্যর্থ হলো

সেদিন মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। পাক বাহিনীর সাথে এই সম্মুখযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য শহীদ হন। তবে ভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে যান।আহত হন আবদুল হাকিমসহ অনেকে। আবদুল হাকিমকে তার সহযোদ্ধারা উদ্ধার করে ভারতের শিলং হাসপাতালে পাঠান। সেখানে তিনি চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় দেশ স্বাধীন হয়ে যায়।

মৃত্যু

আমাদের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ২০০১ সালে মৃত্যু বরণ করেন।

মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাকিম মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাকিম মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হাকিম

(Visited 275 times, 1 visits today)
Share this story with your friends:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *