মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ-মাইনের আঘাতে পা হারানো একজন বীর

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলার জনগণ নিজেদের জীবন বাজি রেখে মোকাবেলা করেছেন হানাদার পাকিস্তান বাহিনীকে। পৃধিবীর বুকে সষ্টি করেছে  আলাদা ইতিহাস। সে ইতিহাস রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, সে ইতিহাস সাহসীকতার ইতিহাস, সেই ইতিহাস নিজেদের অধিকারের জন্য মাথা নত না করার ইতিহাস।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সারা বাংলার অগণিত মানুষের মত আমাদের নোয়াখালীর বীর সন্তানরাও  প্রতিরোধ করেছে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তার দোষর রাজাকার, আল বদর, আল শাশস সহ সকল অপশক্তিকে। এই অপশক্তি রোখতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন নোয়াখালীর অনেক বীর সন্তান।অনেকে সফলভাবে ফিরে এসেসেন স্বাধীন বাংলায় আবার অনেকে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য। আমাদের নোয়াখালীর আরেক বীর সন্তান মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ সম্র্পকে আজকে আমরা জানব।

আরো পড়ুনঃ শহীদ আবুল বাশার || বীর বিক্রম || নোয়াখালীর গর্ব

নাম

মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ

জন্মস্থান

নোয়াখালী জেলার কবিরহাট উপজেলার রামেশ্বরপুর গ্রামে (ডাকঘর: চাপরাশিরহাট) এই বীর সন্তান জন্ম গ্রহণ করেন।

জন্ম‍ সাল

তার জন্মসাল সর্ম্পকে কোন তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

যে কারণে পরিচিত

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ  উপাধি “বীর বিক্রম”  উপাধিতে ভূষিত হন।

পরিবার পরিচিতি

পিতা: রমজান আলী

মাতাঃ আফিজা খাতুন

স্ত্রীঃ হাজরা খাতুন

সন্তানঃ দুই মেয়ে

কর্মজীবন

মোঃ আমিন উল্লাহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে এই রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল কুমিল্লা সেনানিবাসে।

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

১৯৭১ সালের  পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর হামলার সময় মোঃ আমিন উল্লাহ কুমিল্লা সেনানিবাসে ছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চে কুমিল্লার চতুর্থ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বেশির ভাগ সেনাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেটের শমসেরনগর পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কারণ হিসেবে দেখানো হয় ভারতীয় আগ্রাসনকে। তারপরও কিছু সেনা ভিতরে থেকে যায়। তার মধ্যে মোঃ আমিন উল্লাহ একজন। চারদিকে যুদ্ধ শুরু হলে  তিনি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি। ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশকে শত্রুমুক্ত করতে। মো. আমিন উল্লাহ যুদ্ধ করেন ২ নম্বর সেক্টর এলাকায়। 

দলনেতার দ্বায়িত্বে ছিলেন আমিন উল্লাহ

১৯৭১ সালের যুদ্ধের এক সময় কুমিল্লা রেলস্টেশন থেকে আখাউড়া অভিমুখ তিন স্টেশন পর এক স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের বড় রকমের যুদ্ধ হয়। ঐ দিন মো. আমিন উল্লাহ  মুক্তিবাহিনীর যে দলে ছিলেন, সেই দলের দলনেতা আহত হন। তখন তার উপর দলনেতার দায়িত্ব এসে পড়ে। তিনি গভীর বিচক্ষণার সাথে নেতৃত্বও দেন।

কুমিল্লায় ভয়াবহ যুদ্ধ

আখাউড়া থেকে তিন স্টেশন পরে পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যে সংঘর্ষ হয় সেটার নেতৃত্ব দেন মোঃ আমিন উল্লাহ। যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনারা ভারী গোলা বারুদ আর আধুনিক অস্ত্র শস্ত্র দিয়ে তীব্র আক্রমণ করতে থাকে। আস্তে আস্তে আক্রমণের তীব্রতা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়। পাকিস্তানি সেনারা গুলিবর্ষণের পাশাপাশি গোলাবর্ষণ শুরু করছিল। যার কারণে যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে।

পাক বাহিনীর তীব্র আক্রমণে যখন মুক্তিযোদ্ধারা বেসামাল হয়ে পড়ে তখন  মো. আমিন উল্লাহ সহযোদ্ধাদের নিয়ে কিছুটা পিছু হটে অবস্থান নেন। তারপর তিনি সহযোদ্ধাদের সেখানে অবস্থান করতে বলে অধিনায়কের সঙ্গে পরামর্শ করতে যান। অধিনায়ক তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন পাকিস্তান বাহিনীর  আক্রমণের তীব্রতা না কমা পর্যন্ত নিরাপদ স্থানে থাকতে। অধিনায়কের সাথে পরামর্শ শেষে  ফিরে দেখেন, দলের তিনজন মুক্তিযোদ্ধা সামনে এগিয়ে বিপদজনক স্থানে চলে গেছেন।

উড়ে গেল মোঃ আমিন উল্লাহ’র পা

দলের তিনজন সহযোদ্ধাকে বিপদ সীমা থেকে ফিরিয়ে আনতে তিনি সামনের দিকে অগ্রসর হন। তাদেরকে বলেন পাক বাহিনীর আক্রমণ কমা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। তাদেরকে নিয়ে ফিরে আসার পথে ভূমিতে পাকিস্তানি সেনাদের পেতে রাখা একটি মাইনের ওপর মোঃ আমিন উল্লার পা পড়ে যায়। সাথে সাথে মাইনটির বিস্ফোরিত হয় এবং  তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটু পর্যন্ত উড়ে যায়। তিনি মাটিতে পড়ে যান। প্রথমে তিনি বুঝতে পারেননি তার পা উড়ে গেছে, যখনই ওঠার চেষ্টা করলেন বুঝতে পারেন তার বাঁ পা নেই।

সহযোদ্ধারা নিয়ে যায় ফিল্ড ক্যাম্পে

যখন তার দেহটা মাটিতে পড়ে আছে, উঠার আর ক্ষমতা নেই সাথে সাথে সহযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করে তাকে ফিল্ড হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন।সেখান থেকে আরো চিকিৎসার জন্য পরে তাকে  ভারতের মাদ্রাজ ও মুম্বাইয়ে পাঠানো হয়। তিনি পুরোপুরি সুস্থ হননি।তবে সব সময় চাইতেন দেশের জন্য আবারও লড়া যায় কিনা।

আরো পড়ুনঃ পর্তুগালে উচ্চশিক্ষার সুবিধা

শেষ বয়সে শেষে তাঁর স্মৃতিশক্তি  লোপ পায়। বিশেষ করে  মুক্তিযুদ্ধকালের কথা মনে করতে পারতেন না। কোন কোন স্থানে যুদ্ধ করেছেন, মাস-সময়, সহযোদ্ধা ও দলনেতার নাম, সাব-সেক্টরের নাম—কোনো কিছুই তাঁর মনে পড়ে না।

মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আমিন উল্লাহ 

(Visited 73 times, 1 visits today)
Share this story with your friends:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *