মোহাম্মদ শাহ আলম || বীর উত্তম || অপারেশন জ্যাকপট

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নোয়াখালীর বীর সন্তান মোঃ শাহ আলম এর অবদান অবিস্মরনীয় হয়ে থাকবে। মেডিকেলের ছাত্র হয়ে নিজের নিশ্চিত ভবিষৎ তে একপাশে সরিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য। নোয়াখালীর এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বাংলাদেশ সরকার বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করে।

নাম

ডাঃ মোঃ শাহ আলম

জন্মস্থান

নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার করমুল্লাপুর গ্রামের ইয়াছিন ভূঁইয়া বাড়ীতে এই সাহসী বীর জন্মগ্রহন করেন।

জন্ম সাল

১৯৪৬

যে কারণে পরিচিত

১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উপাধি “বীর উত্তম” উপাধিতে ভূষিত করা হয় মোঃ শাহ আলমকে।

পরিবার পরিচিতি

পিতাঃ মো. আলী আহম্মদ চৌধুরী
মাতাঃ জমিলা খাতুন
স্ত্রীঃ নাছিরা আক্তার
সন্তানঃ একমাত্র মেয়ে সাবরিনা আলম

কর্মজীবন

১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন মোঃ শাহ আলম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

আরো পড়ুনঃ শহীদ এরশাদ আলী || বীর উত্তম || আমাদের গর্ব

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই দেশের নিরীহ বাঙালির উপর আক্রমন শুরু করে তখন মোঃ শাহ আলম নিজের মেডিকেলের পড়াশুনা বাদ দিয়ে যোনদেন যুদ্ধে। দেশকে শত্রুমুক্ত করার তাড়না থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। যুদ্ধের এক সময় তিনি ভারতে গিয়ে নৌ-কমান্ডো বাহিনীতে যোগ দেন।

শত্রু পক্ষের জাহাজ ডুবানোর পরিকল্পনা

১৯৭১ সালের মধ্য আগস্টে মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডোরা বন্দরে অবস্থানরত জাহাজ মাইনের সাহায্যে ডুবিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।এই জন্য একটি তারিখ নির্ধারন করেন। এই বিশাল কাজটি করতে হলে প্রয়োজন সূক্ষ্ম পরিকল্পনা। কোনরূপ হেরফের হলে সকলেই মারা যাবে। তাই নির্ধারিত তারিখের আগের দিন, দিনের বেলায় নৌ-কমান্ডোরা এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করার জন্য দল গঠন করেন।মোঃ শাহ আলম ছিলেন নৌ-কমান্ডোদের একটি দলের দলনেতা। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজে গিয়েই এলাকাটা পর্যবেক্ষণ করবেন।

জাহাজ ডুবানোর খবরে তোলপাড় বিশ্ব

মোঃ শাহ আলম অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পুরো এলাকাটি পর্যবেক্ষণ করেন এবং একটি সঠিক পরিকল্পনা তৈরি করেন। তিনি নিজদায়িত্ব পালন করে গোটা অপারেশন সফল করেন। এই রকম আকস্মিক আক্রমনে পাকিস্তানি সেনারা হকচকিত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। এই ঘটনাপুরো বিশ্বে তোলপাড় তুলল।

অপারেশন জ্যাকপট

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ হলো এক ঐতিহাসিক ঘটনা। মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো অভিযান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নতুন মাত্রা এনেছিল। এটি বহির্বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করে। অপারেশন জ্যাকপটের আওতায় চট্টগ্রাম বন্দরে অভিযান পরিচালনা জন্য তিনটি দলের সমন্বয়ে কমান্ডো দল গঠন করা হয়। এর একটি দলের দলনেতা ছিলেন মো. শাহ আলম।

অপারেশনের সংকেত ছিল গান

এ অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য কমান্ডে্ারা ভারতের পলাশি প্রশিক্ষণঘাঁটি থেকে ২ আগস্ট চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। পরিকল্পনা ছিল ১৩ ও ১৪ আগস্ট আকাশবাণী বেতারকেন্দ্র থেকে গানের মাধ্যমে দুটি ঘোষণা দেওয়া হবে। আর ঐ ঘোষণা দুটি শোনার পরই কমান্ডোরা অপারেশন শুরু করবেন। ঘোষনা দুটির একটি হলো পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া একটি গান, ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান।’ এ গান শোনার সঙ্গে সঙ্গে কমান্ডোরা অপারেশনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকবেন। দ্বিতীয় ঘোষণা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গান, ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুরবাড়ি।’ এ গান শোনার সঙ্গে সঙ্গে কমান্ডোরা প্রস্তুতি ওই দিন মধ্যরাতে অপারেশন করবেন। এতে পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন। এ সংকেতটি সকল কমান্ডোকে জানানো হয়নি। শুধুমাত্র সমন্বয়ক ও দলনেতাই জানতেন।


কমান্ডো বাহিনীর যাত্রা শুরু

নৌ-কমান্ডোরা আগরতলা হয়ে ৮ আগস্ট ১ নম্বর সেক্টরের হরিণা ক্যাম্পে পৌঁছান। সেদিন রাতেই তাঁরা বাংলাদেশে ঢোকেন। সেখান থেকে নৌকা করে এবং হেঁটে কমান্ডোরা ১৩ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরের কাছাকাছি পৌঁছান। পরে ভাগ হয়ে শহরের ভেতরে বিভিন্ন নিরাপদ বাড়িতে আশ্রয় নেন। চট্টগ্রাম শহরের সবুজবাগ হোটেলটিতে নৌ-কমান্ডোরা মিলিত হতো।

রেকির দ্বায়িত্বে ছিলেন শাহ আলম

নৌ-কমান্ডোদের এই অপরারেশনটি ছিল খুবই বিপদজনক এবং এই জন্য বন্দর সর্ম্পকে সম্পূর্ণ ধারনার প্রয়োজন ছিল। বন্দরে পাকিস্তানি সেনা কতজন থাকে, তারা কোন কোন স্পটে অবস্থান করে, নির্ধারিত দিনে বন্দরে কয়টি জাহাজ থাকবে, বয়রাগুলোর অবস্থান ইত্যাদি জানা এবং কর্ণফুলীর টাইটাল চার্ট সংগ্রহ করা প্রয়োজন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে সাথে এটি খুবই বিপদ জনক কাজ ছিল। আর এই বিপদের কাজটির দ্বায়িত্ব নেন মোঃ শাহ আলম।আর তিনি এটি দক্ষতার সাথেই পালন করেছেন।

অপরাশন শুরু

১৫ আগস্ট মধ্যরাতে পরিকল্পনা অনুসারে নৌ-কমান্ডোরা সফলতার সঙ্গে অপারেশন শুর করেন। এই অপারেশনে ১০টি টার্গেট সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস বা পানিতে ডুবিয়ে ফেলা হয়। এগুলো ছিল জাহাজ, গানবোট, বার্জ ও পল্টুন। চট্টগ্রাম বন্দরের এই  ভয়াবহ অপারেশনের খবর সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম এ ঘটনা ফলাও করে প্রচার করে।

সম্মানা

মুক্তিযুদ্ধে এমন বীরত্ব জন্য বাংলাদেশ সরকার এই বীরকে বীর উত্তম উপাধি দেয়।

মৃত্যু

১৯৮৫

(Visited 194 times, 1 visits today)
Share this story with your friends:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *