লুক্সেমবার্গঃ পশ্চিম ইউরোপের ছোট একটি দেশ

মুহাম্মাদ মাঈনুদ্দিনের ফেসবুক ওয়াল থেকে।
কেমন ছিল লুক্সেমবার্গ ট্যুর?
নেদারল্যান্ডস আসছি প্রায় এক বছরের উপর। কিন্তু ডেন হাগ আর রটারডাম শহর ছাড়া কোথাও যাওয়া হয়ে উঠেনি টেবিলের সাথে এতটা সখ্য ছিল যে বন্ধু যখন বিভিন্ন দেশে ট্যুর দিচ্ছিল তখন আফসোস করা ছাড়া উপায় ছিল না। অবেশেষ কিছুটা ফ্রি হয়েই বের হয়ে যাওয়ার চিন্তা করলাম। দেশে থাকতে ঘুরতে ফিরতে থাকা ছেলেটা আর কতদিন টেবিলে বসে থাকবে? তাই যখন বন্ধু বলল- ব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে গেলাম। ইউরোপের প্রথম ট্যুর – লুক্সেমবার্গ।
লুক্সেমবার্গ পশ্চিম ইউরোপের একটি দেশ। এর সরকারি নাম গ্র্যান্ড ডাচি লুক্সেমবার্গ। এর পশ্চিম ও উত্তরে বেলজিয়াম,  পূর্বে জার্মানি ও দক্ষিণে ফ্রান্স। দেশটির আয়তন মাত্র ২৫৮৬.৪ বর্গ কিঃমিঃ আর জনসংখ্যা ৬ লাখ থেকে একটু বেশী।
Luxembourg - লুক্সেমবার্গ
আমাদের যাত্রাঃ
ঈদের দিন সকালে ঈদের জামায়ত শেষে বাসায় এসে একটু খেয়ে ১২.১০ এর আমরা তিনজন-আমি, Ahammed Zubayer  এবং Ferdous Hassan ভাই  ট্রেনে চড়ে বসলাম।  টিকেট আগেই কাটা ছিল। আমাদেরকে যেতে হবে বেলজিয়াম হয়ে। মোট তিনিটি জায়গায় এক্সচেঞ্জ ছিল।
লুক্সেমবার্গ পৌঁছালাম বিকাল ৬টা। ঐখানে Faisal Hawlader   ভাই আমাদের অপেক্ষায় ছিল। আমাদেরকে লুক্সেমবার্গ ঘুরে দেখানোর জন্য ওনিও উদগ্রীব হয়েছিল। তাই- নামার সাথে সাথে বলল-বাসায় ব্যাগ রেখে বের হয়ে যাই চলেন। আমাদের সাড়ে ৫ ঘন্টার জার্নি ছিল। কিছুটা ক্লান্ত হলেও বিকেলটা নষ্ট করতে রাজি নই আমরা। তাই ব্যাগটা রেখেই বের হয়ে গেলাম। আমাদের সাথে যোগ দিলেন Saddam Hossain   ভাই।
পুরো বিকেলটা Esch-sur-Sûre এ ঘুরলাম। এটি লুক্সেমবার্গের দ্বিতীয় শহর এবং ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী জনসংখ্যা ৩৫ হাজার ৪০ জন।  এর পাশেই ছিল ফ্রান্সের ছোট শহর ভিলিরাপ্ট (Villerupt)। গাড়ি নিয়ে ঢুকে গেলাম শহরটি দেখার জন্য। এক টিকেটে দুই ছবি দেখার মত। ছোট্ট একটি নিরিবিলি শহর। আয়তনে মাত্র ৬.৫৬ বর্গ কিমি,  আর জনসংখ্যা ৯৮২৭ জন ( ২০১৮ তথ্য অনুসারে)। পুরো শহরটা মনে হয় ঘুমিয়ে আছে। এর কারণ হতে পারে ৬ টার পর এমনিতেই সব বন্ধ,  তার উপর ছুটির দিন ছিল। তবে এইখানে নাকি এমন নিস্তব্ধতাই থাকে ।  মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল এত নিঃস্তব্ধতার জীবন আমাদের পক্ষে কাটানো আধো সম্ভব? কতক্ষণ শহরটা ঘুরে দেখলাম। তারপর আরো কিছু জায়গায় গিয়ে গাড়ি থামিয়ে চারদিক দেখতে লাগলাম। যদিও ক্লান্ত ছিলাম, কিন্তু ভালোও লাগছিল।
রাত ৯ টার দিকে কিছু খাবার কিনে পার্কিং এ বসেই খেয়ে নিলাম। লুক্সেমবার্গের যেটি সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখলাম সেটা গাড়ি পার্কিং।  কয়েক ঘন্টা ঘুরে একটি পার্কিং স্পেস পাওয়া দুষ্কর। ফ্রি নয়, ঘন্টা হিসেবে ভাড়া দিয়েও স্পেস পাওয়া যায় না।
মুলারথাল (Mullerthal)
Luxembourg - লুক্সেমবার্গ
পরেরদিন সকালে উঠে আমরা ছুটলাম মুলারথালের উদ্দেশ্যে। ফয়সাল ভাই গাড়ি ড্রাইভ করে নিয়ে যাচ্ছে।  যাওয়ার সময় পাহাড় আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা। ছবির মতই সুন্দর।  দুদিকে পাহাড়, বড় বড় গাছ, তার মাঝদিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে। মুলারথলাকে বলা হয় “লিটল সুইজারল্যান্ড”। মাত্র ৬২ জন জনসংখ্যার অঞ্চলটি বেলেপাথরের অনন্য বৈশিষ্ট্যযুক্ত একটি বায়োটোপ। মুলারথাল ট্রেলটি হাইকারদের বেশ পছন্দের জায়গা।
ভায়েনডেন ক্যাসল (vianden castle)
Luxembourg - লুক্সেমবার্গ।
মুলারথালে ঘন্টা তিনেক কাটিয়ে আমরা রওনা দিলাম ভায়েনডেন ক্যাসল এর উদ্দেশ্যে। এটি রোমানেস্ক এবং গথিক সময়কালের অন্যতম বৃহত্তম এবং সবচেয়ে সুন্দর ফিউডাল রেসিডেন্সি। দুর্গটি ১১ থেকে ১৪  শতকের মধ্যে  নির্মিত হয়েছিল এবং ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রের মালিকানাতে যাওয়ার আগে গ্র্যান্ড ডুকাল পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিল।  ভায়ানডেন ক্যাসেল ইউরোপের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ। এর ভিতরকার কারুকার্য আমার কাছে এত আকর্ষণীয় মনে না হলেও, বাহিরের দিকটা খুবই আকর্ষণীয়। এছাড়া ঐসময়ে ব্যবহারিত বিভিন্ন জিনিসপত্রের সংরক্ষণ করা হয়েছে। সংরক্ষিত জিনিসপত্র থেকে  ঐ সময়ে তাদের জীবন-যাপনের একটি ধারনা পাওয়া যায়।
ভায়েনডেন ক্যাসল থেকে আমরা বের হয়ে কোনদিকে যাব চিন্তায় পড়ে গেলাম। এদিকে পেটের অবস্থা বারোটা। আশে পাশে কোন রেস্তোরাঁও পাচ্ছিলাম না। কিছু আছে, সেগুলোতে হালাল খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে সবারই পেটের আর্তনাদ  মাথায় গিয়ে ঠেকছে। কেউ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা। অবশেষে পেট্রোল পাম্পের একটি সুপারশপ থেকে পাস্তা নিয়ে গাড়িতে বসেই দুপুরের খাবার সারলাম।
তারপর আবার গাড়ির চারচাকা ঘুরা শুরু করলো। পাহাড়ের মাঝ, কিংবা দূরের বিশাল পাহাড় আর সমতলের মাঝ দিয়ে সরু রাস্তা ধরে যখন গাড়ি যাচ্ছিল চারপাশের সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করার মত শব্দ আমার জানা নেই। কিবোর্ড দিয়ে সে সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করা যায় না, ক্যামেরার ক্লিকেও সেই সৌন্দর্যে তুলে আনা যায় না। শুধু চোখভরে দেখা যায়, তৃপ্তি পাওয়া যায়। চোখের তৃপ্তি,  মনের তৃপ্তি।  পুরো বিকেলটাই গাড়ি করে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। আর মাঝে মাঝে গাড়ি থেকে নেমে পাগলের মত চিৎকার। সেই এক অন্য রকম আনন্দ।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল লুক্সেমবার্গের আরেকটি গ্রাম ” সেনজেন”। এটি আঙ্গুর চাষ ও এলকোহল তৈরির জন্য বিখ্যাত। গ্রামটি দক্ষিণ-পূর্ব লুক্সেমবার্গের মুসেল নদীর তীরে অবস্থিত। এখানে জার্মানি, ফ্রান্স এবং লুক্সেমবার্গে সীমানা মিলিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এই পয়েন্টাতে।
তৃতীয় দিনটা আমরা লুক্সেমবার্গ শহর দেখে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিই। আবহাওয়াটা আমাদের অনুকূলে ছিল না। পূর্বের দুইদিন এত সুন্দর রৌদ্রময় আবহাওয়া ছিল, কিন্তু শেষ দিনে সারাদিন বৃষ্টি। তারপরও আমাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। গাড়িতে করে পুরো শহরটা ঘুরা, বৃষ্টি থামলেই আবার গাড়ি থেকে নেমে পড়া। ইউরোপের বৃষ্টিটা এত রোমান্টিক নয় যে মন ভরে ভিজবেন। খুবই ঠান্ডা।  তাই সামান্য বৃষ্টিতে ভিজলেও ঠান্ডায় কাঁপতে শুরু করেছিল সবাই।  শহরের মধ্যে Place Guillaume II, statue of Grand Duchess Charlotte, grand ducal palace, Bock casemates, Luxembourg airport, University of Luxembourg সহ আরো কিছু স্থানে ঘুরেছি।
লুক্সেমবার্গে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফ্রি। আমাকে যেটা আকৃষ্ট করেছে তা হলো ওদের সাইকেল সিস্টেমটা। রাস্তার পাশে ইলেক্ট্রনিক  সাইকেল লক করা রয়েছে। ঐখানে যারা বসবাস করে তাদের কার্ড রয়েছে। যে কেউ কার্ড স্ক্যান করে সাইকেল নিতে পারছে। আবার সে লক করে রাখছে। ধরুন, আপনি পয়েন্ট “এ” থেকে “বি”তে যাবেন। পয়েন্ট “এ” থেকে সাইকেল নিলেন, “বি” তে গিয়ে দেখবেন রাস্তার পাশে সাইকেল লক করার স্ট্যান্ড আছে। শুধু লক করে দিলেন। আপনার কাজ শেষ। আপনাকে সাইকেল পয়েন্ট “এ” তে নিয়ে আসতে হচ্ছে  না। আবার চার্জও অটো হচ্ছে।  আমার কাছে এটি দারুন লেগেছে।
খাবার খরচ লুক্সেমবার্গে নেদারল্যান্ডসের কাছাকাছিই। ঐখানে ইউনিভার্সিটি ফি, ট্রান্সপোর্ট  ফি ফ্রি, বাসা ভাড়া কিছুটা বেশী। খাবারের খরচ অলমোস্ট নেদারল্যান্ডসের মতই মনে হলো। বাংলাদেশী যারা ঐখানে রয়েছে তাদের কয়েকজন থেকে জানতে পারলাম  পার্টটাইম জবের অবস্থা খুব একটা ভালো না।
ফিরে আসাঃ
আমাদের ট্রেন ছিল ৭.১৬ তে। সারা শহর ঘুরেফিরে ট্রনে গিয়ে বসলাম। কিন্তু বেলজিয়াম এসে পড়লাম আসল সমস্যায়। আগের ট্রেন ৭ মিনিট দেরি করেছে, তাই আমরা এক্সচেঞ্জ ট্রেইনটা আর ধরতে পারলাম না। কিন্তু, টিকেট চেক করে দেখি আসলে আমাদের ট্রেন ছিল ৭:১৬ ই, নট ১৯:১৬. অর্থাৎ সকাল ৭:১৬ তে ছিল, আমরা সন্ধ্যা ৭:১৬ তে গিয়ে কি করে ট্রেন পাব? এর শাস্তিস্বরূপ রাত ১১ টা থেকে ভোর ৬ টা পর্যন্ত স্টেশনের বাহিরে ঠান্ডায় বসে থাকা। যদিও এতে একটা উপকার হয়েছে। ৩/৪ ঘন্টা হেঁটে হেঁটে রাতের ব্রাসেলসটা দেখে ফেললাম। এখন বেলজিয়াম  ট্যুর দেওয়ার জন্য অপেক্ষায়!
ধন্যবাদ ফয়সাল ভাই এবং সাদ্দাম ভাইকে তাদের মূল্যবান তিনটি দিন আমাদেরকে দেওয়ার জন্য।
(Visited 90 times, 1 visits today)
Share this story with your friends:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *