শহীদ এরশাদ আলী || বীর উত্তম || আমাদের গর্ব

 

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নোয়াখালীর বীর সন্তান শহীদ এরশাদ আলী এর অবদান অবিস্মরনীয় হয়ে থাকবে। আমাদের নোয়াখালী জেলার সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আমরা একটা তথ্য ভান্ডার করার চিন্তা করছি। এর আগে আমরা জেনেছি শহীদুল্লাহ মুন্সি সম্পর্কে। আসুন আজকে জেনে নিই বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এরশাদ আলীর কথা।

নাম‍          

এরশাদ আলী

 

জন্মস্থান

নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার বিষ্ণবপুর গ্রামে এই সাহসী বীর জন্মগ্রহন করেন।

 

জন্ম‍ সাল

১৯৩৫

 

যে কারণে পরিচিত

নোয়াখালী জেলার একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ  উপাধি “বীর উত্তম”  উপাধিতে ভূষিত করেন।

 

পরিবার পরিচিতি

পিতাঃ আলী মিয়া

মাতাঃ আসমতের নেছা

স্ত্রীঃ মোসাম্মৎ নুরুন নেছা

সন্তানঃ একমাত্র মেয়ে

 

কর্মজীবন

ইপিআরে (বর্তমান-বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এ চাকরি করতেন এরশাদ আলী।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় তিনি দিনাজপুর ইপিআর সেক্টরের রংপুর উইংয়ে কর্মরত ছিলেন।

 

মুক্তিযুদ্ধে যোগদান

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই দেশের নিরীহ বাঙালির উপর আক্রমন শুরু করে তখন এরশাদ আলী যুদ্ধে যোগদানের তাড়না অনুভব করেন। এই তাড়না থেকে শক্রুকে মোকাবেলা করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে।

 

সম্মুখ যুদ্ধের যোদ্ধা

 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতের পর যখন সারা দেশে মুক্তির ডাক আসে তখন রংপুর ইপিআর উইংয়ের বাঙালি সেনারা ক্যাম্প ছেড়ে অবস্থান নেন রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলায়। পাকিস্তানিরা ইতিমধ্যে জেনে গেছে কাউনিয়ায় রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল যেখানে ইপিআর সেনারাও রয়েছে। এই খবর পেয়ে ৩১ মার্চ রংপুর সেনানিবাস থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৬ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স কাউনিয়ার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

ইপিআর সেনারা এই খবর পেয়ে যান। তারা জানত, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে হলে কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে। তারা কিছুটা পিছু হটে তিস্তা রেলসেতুর কুড়িগ্রাম প্রান্তে অবস্থান নেন। আমাদের এই ইপিআর সেনাদেরকে সহযোগিতা করতে সেখানে তাদের সাথে যোগ দেয় লালমনিরহাট, কালিগঞ্জ, হাতিবান্ধা, পাটগ্রাম ও কুড়িগ্রাম থেকে আসা ইপিআর সেনা, পুলিশ, আনসার ও ছাত্র-জনতা।

১ এপ্রিল কাউনিয়া রেলস্টেশন থেকে একদল পাকিস্তানি সেনা ট্রেনে তিস্তা সেতু অভিমুখে যাত্রা করে।আবার আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা কৌশল অবলম্বন করে। তাঁরা তিস্তা রেলসেতুর মাঝের স্লিপার খুলে কুড়িগ্রাম প্রান্তে লাইনের ওপর গাছের গুঁড়ি ফেলে রাখেন। ২ এপ্রিলে পাকিস্তানিদের এই দলটি যখন তিস্তা রেলসেতুতে পৌঁছায় তাদের সাথে আমাদের বীর সেনাদের ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। ইপিআর সেনারা সেতুর কুড়িগ্রাম প্রান্তে প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের অপেক্ষায় ছিলেন। পাকিস্তানি সৈন্য বহনকারী ট্রেনটি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের আওতায় আসামাত্র তাঁরা একযোগে আক্রমণ চালান। পাকিস্তানি বাহিনীও পাল্টা আক্রমণ চালায়। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর, ১৫ জন সেনা ও কাউনিয়া থানার ওসি নিহত হন। বাকি পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায়।

 

সাহসি এরশাদ আলী ও তার সহযোগিরা

 

পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নতুন একটি দল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রংপুর সেনানিবাস থেকে পরদিন এসে আবার আক্রমণ চালায়। হঠাৎ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমন বুঝে উঠতে পারেনি মুক্তিযোদ্ধারা। ফলে তাঁরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। ব্যাপক গোলাবর্ষণের মুখে বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধা পাঁচ-সাত শ গজ পিছু হটে অবস্থান নেন। কিন্তু এরশাদ আলীসহ কয়েকজন নিজ নিজ বাংকারেই থাকেন। পাকিস্তানিরা পাল্টা আক্রমন না পেয়ে ঐসময় থেমে থাকে।

 

দেশ মাতৃকার জন্য জীবন দিলেন

 

এরশাদ আলীসহ যারা নিজ বাংকারে ছিলেন তারা সারা রাত খুব সতর্কতার সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।সবাই নিজ নিজ বাংকারে সতর্ক অবস্থায় ছিলেন। রাতে তাঁরা পালা করে ঘুমালেন।

সকাল বেলায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর্টিলারি গোলাবর্ষণ শুরু করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পুরো প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে। তারা বিপুল সংখ্যক সেনাবাহিনী সেখানে জড়ো করে এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর ক্রমাগত আক্রমন করতে থাকে। এত বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্যের বিপরীতে বাংকারে ছিলেন অল্প সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা। ফলে তারা বুঝে উঠতে পারছিলে না কি করবেন। কিন্তু পিছু হটতেও নারাজ।

নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে যে করেই হোক পাকিস্তানিদের পরাজিক করতেই হবে এই প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছেন মনে মনে। বাকি সবাই ছত্রবঙ্গ হয়ে গেলেও এরশাদ আলী মাটি কামড়ে পড়ে থাকলেন বাংকারে। লড়াই করতে থাকলেন নিজের সবটুকু দিয়ে। তার এই সাহসিকতা সাথে থাকা বাকি মুক্তিযোদ্ধাদের উজ্জিবিত করলো। তারাও নিজ নিজ বাংকার থেকে আক্রমন করতে থাকে। হঠাৎ করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি গুলি এসে লাগল এরশাদ আলীর বুকে। বাংকারে লুটিয়ে পড়লেন তিনি। তার মৃত্যু বাকিদের মনোবল ভেঙ্গে দিল। অন্য মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হলেন। বাংকারেই পড়ে ছিল আমাদের এই বীর সেনার নিথর দেহ। পরবর্তীতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানটি দখল করে নেয়।

 

সম্মানা

 মুক্তিযুদ্ধে এমন বীরত্ব জন্য বাংলাদেশ সরকার এই বীরকে বীর উত্তম উপাধি দেয়।

আমরা এই মহান ব্যক্তির দেশের প্রতি অবদানকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে যাব সারা জীবন।

(Visited 177 times, 1 visits today)
Share this story with your friends:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *